September 14, 2026, 11:10 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
জালিয়াতির অভিযোগে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ওই কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীদের কুমারখালী সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত না হয়ে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসে পরীক্ষা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। পরে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ব্যবহৃত ‘ইনভিজিলেটর অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীর ওএমআর শিট স্ক্যান করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রের সিস্টেমে জমা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে ম্যানুয়াল উপস্থিতির হিসাব ও ইনভিজিলেটর অ্যাপে স্ক্যান করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে গরমিল ধরা পড়ে। ম্যানুয়াল উপস্থিতির হিসাবে একজন পরীক্ষার্থী কম থাকায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্টরা জানতে পারেন, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকা ওই শিক্ষার্থী সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের একটি কক্ষে বসে পরীক্ষা দেন।
পরে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রের ইনভিজিলেটর অ্যাপের কোনো একটি আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ওই শিক্ষার্থীর ওএমআর শিট স্ক্যান করে কেন্দ্রের সিস্টেমে জমা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওই শিক্ষার্থী তাদের কেন্দ্রে উপস্থিত না হওয়ায় তাকে অনুপস্থিত দেখানো হয়েছিল। কিন্তু ইনভিজিলেটর অ্যাপে তাকে উপস্থিত দেখানো হয়। পরে তিনি কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষকে বিষয়টি জানান। একই সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া মডেল থানায় দায়ের করা অভিযোগের কপিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ছবি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ টিপু সুলতান বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করেছে। কেন্দ্রটি বহাল রাখার জন্য তারা চেষ্টা করছেন।
পরীক্ষা গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পরীক্ষার জন্য আগে থেকেই কেন্দ্র নির্ধারণ করা থাকে। পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা দেওয়ার নিয়ম। উপস্থিতি গ্রহণ, প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র বিতরণ, পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র সংগ্রহ এবং ওএমআর স্ক্যানসহ প্রতিটি ধাপ সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, তাকে কেউ সহযোগিতা করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাদের মতে, ইসলামিয়া কলেজের একটি কক্ষে বসে একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেওয়া এবং পরে তার ওএমআর কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রের ইনভিজিলেটর অ্যাপের মাধ্যমে জমা হওয়ার অভিযোগকে শুধু একজন শিক্ষার্থীর অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের এক শিক্ষক বলেন, নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরে কোনো পরীক্ষার্থীকে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হলে বিষয়টি একাধিক ব্যক্তির জানার কথা। কারণ পরীক্ষার জন্য প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। আবার পরীক্ষা শেষে ওএমআর স্ক্যানের বিষয়টিও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজরদারির মধ্যে থাকার কথা।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী এক জায়গায় পরীক্ষা দিলেন, অথচ তার ওএমআর অন্য একটি কেন্দ্রের ইনভিজিলেটর অ্যাপ দিয়ে জমা হলো—এটি কীভাবে সম্ভব হয়েছে, সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ওই শিক্ষক আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থীর একার পক্ষে এ ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাকে কোথায় পরীক্ষা দিতে হবে, কে কক্ষের ব্যবস্থা করবেন, পরীক্ষা চলাকালে কে তদারকি করবেন এবং পরে ওএমআর কীভাবে স্ক্যান হবে—প্রতিটি ধাপেই অন্য কারও সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। তাই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনভিজিলেটর অ্যাপের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারে। কোন আইডি ব্যবহার করে ওএমআর স্ক্যান করা হয়েছে, কখন স্ক্যান করা হয়েছে, কোন ডিভাইস থেকে তা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে ওই সময় কে লগইন করেছিলেন—এসব তথ্য যাচাই করা গেলে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র, উপস্থিতি শিট, কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী তালিকা এবং কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজে ওই দিন পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে কোনো নথি, ছবি বা অন্য কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ এসেছে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
ঘটনার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. এনামুল করিম বলেন, বিষয়টি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অনার্স পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কুমারখালী সরকারি কলেজ কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।